Monday June 17, 2013
HEADLINE
নেপালে রাজনৈতিক সঙ্কট
26 June 2012, Tuesday, 10:36:26 pm
নেপালে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। এ সঙ্কট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলো যাতে একটা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারে সে লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ড. রামবরণ যাদব চেষ্টা করছেন। গত রোববার সকালে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি টি পার্টির আয়োজন করেন।
সংবিধান প্রণয়ন ছাড়াই গত ২৮ মে সাংবিধানিক পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার কারণে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। টি পার্টিতে ২৫টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নতুন সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রথমেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে বলে বিরোধী দলগুলোর দাবি রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে আরো জটিল করে তুলেছে। টি পার্টিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট পরমানন্দ ঝা, প্রধানমন্ত্রী বাবু রাম ভট্টরাই, মাওবাদীদের চেয়ারম্যান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্দ, ইউএমএল চেয়ারম্যান ঝালনাথ খানাল ও ন্যাশনাল কংগ্রেস (এনসি) সভাপতি সুশীল কৈরালা অংশ নেন।
সাংবিধানিক পরিষদ ভেঙে দিয়ে দেশকে সঙ্কটে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী বাবুরাম ভট্টরাই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি বেশ খোশ মেজাজেই আছেন। গত ৯ জুন এক মেডিক্যাল কলেজে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার আগে তিনি একটি সাক্ষাৎকার দেন কাঠমান্ডুতে তার দফতরে বসে। ৬০০ আসনবিশিষ্ট সাংবিধানিক পরিষদ ভেঙে গেলেও সব কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। এ পরিষদ পার্লামেন্ট হিসেবেও কাজ করেছে। ভট্টরাই সাংবিধানিক পরিষদ (সিএ) ভেঙে দিয়ে আগামী নভেম্বর মাসে নতুন সিএ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। সাংবিধানিক পরিষদ ভেঙে দেয়ার সময় যেমন তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এখনো তিনি সে পদেই বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
ভট্টরাইয়ের পক্ষে কিছু আইনি সমর্থন আছে। সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক পরিষদের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না বলে রায় দিয়েছেন। বিরোধী রাজনীতিক ও প্রেসিডেন্ট রাম বরণ যাদব এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। তবে বিরোধী দলের অন্য নেতারা মি. ভট্টরাইয়ের পদত্যাগ দাবি করেছেন। দু’টি বড় অমাওবাদী দল নেপালি কংগ্রেস (এনসি) ও ইউনিফাইড মার্কসিস্ট-লোকনিস্ট দল (ইউএমএল)সহ ২২ দলীয় জোট ভট্টরাইয়ের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে। তারা বলেছে, এ ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। এ সঙ্কট নিরসনে যেসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তা হলোÑ পুরনো সিএ পুনর্গঠন, একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান এবং নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচন করা; যাতে একটি সংবিধান অনুমোদন করা যায়।
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিন কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত অত্যন্ত গরিব দেশ নেপালে দীর্ঘ দিনের রাজতন্ত্র অবসান বিপ্লবের সর্বশেষ পর্যায়ে এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৬ সালে নেপালে ১০ বছরের মাওবাদী সহিংসতার অবসান ঘটে। এ সহিংসতায় প্রাণ হারায় দেশটির ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। এরপর মাওবাদীরা প্রধান প্রধান দলের সাথে মিলে রাজতন্ত্র ও নির্যাতনকারী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, যা তাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে মাওবাদীরা একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটে। নেপাল একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দেশটি কী ধরনের প্রজাতন্ত্র হবে তা নির্ধারণের জন্য এখন তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অন্তত প্রকাশ্যে বলছে যে নেপালকে একটি ‘ফেডারেল’ রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে তারা রাজি আছে। কিন্তু এর মধ্যেই সমস্যা শুরুর বিষয় নিহিত রয়েছে। নেপালে রয়েছে অনেক ভাষাভাষী, জাতিগোষ্ঠী, ধর্মের মানুষের বসবাস। প্রধানত এর হিন্দুসমাজে রয়েছে জাতিভেদ প্রথা। দেশটির আমলাতন্ত্র, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে পার্বত্যাঞ্চলের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা (ভারতীয় ভাষায় তাদেরকে বলা হয় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় আর নেপালি ভাষায় বাহুন ও ছেহব্রিশ)। এরা মোট সংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। তাদের প্রাধান্যের কারণে কোণঠাসা হয়ে রয়েছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্যরা। তারা হলো ভারত সীমান্তসংলগ্ন সমতলভূমির মাধেশি সম্প্রদায় তিবেতো-বর্মণ ভাষাভাষী ‘আদিবাসী গ্রুপ’ জানাজাতি ও দলিত বা ‘অস্পৃশ্যরা’। এসব গ্রুপ এখন তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে চায়।
গৃহযুদ্ধের সময় মাওবাদীরা তাদের এসব ক্ষোভকে পুঁজি করে শক্তি সঞ্চয় করে। দলটির রাজনৈতিক বক্তব্যে বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। এনসি ও ইউএসএল নেতাদের মতো মি. ভট্টরাই ও তার কমরেডরা হলেন পার্বত্য উচ্চভূমির উচ্চবর্ণের মানুষ।
তৎসত্ত্বেও তারা মাধেসী, জানাজাতি ও দলিতদের দাবির বিরোধী নয়Ñ সমর্থক হিসেবেই নিজেদেরকে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। এর বিপরীতে এনসি ও ইউএমএল নিজেদেরকে উচ্চবর্ণের দল হিসেবে তুলে ধরছে।
মাওবাদীদের সমালোচকেরা মাধেশি ও অন্যদের অধিকারের পক্ষাবলম্বনে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে একটি কুটিল রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে যা আগুন নিয়ে খেলার সমতুল্য।
নতুন সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত পার্লামেন্টের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং প্রত্যক্ষ ভোটে একজন নির্বাহী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। মাওবাদীদের বিরোধীদের ভট্টরাইয়ের কমরেড পুষ্পকমল দাহালের (এক সময় তিনি প্রচন্ড নামে পরিচিত ছিলেন) উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে ভয় রয়েছে। ১০ বছরের গৃহযুদ্ধ চলাকালে প্রচন্দ দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের আশঙ্কা প্রচন্ড একবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারলে তিনি আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকার চেষ্টা করবেন। তবে ভট্টরাই বলেছেন, মাওবাদীরা তাদের অতীত একনায়কতান্ত্রিকতা পরিত্যাগ করে নতুন ধরনের মাওবাদী দলে পরিণত হয়েছে, যারা সমাজ পরিবর্তনে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস করেন।
সবাই কিন্তু তাদের এ কথা বিশ্বাস করতে পারছেন তা নয়। তবে নেতারা দলের আদর্শকে বিকিয়ে দিচ্ছে অভিযোগ করে একটি কট্টরপন্থী উপদল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। এ ঘটনায় মাওবাদীদের বক্তব্য অনেক, যা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছে। ভট্টরাই বলেছেন, দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, তিনি একাই যখন নির্বাচনের জন্য সামনে অগ্রসর হচ্ছেন তখনই তার বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক মনোভাব পোষণের অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাই কেবল মাওবাদীদের নয় অন্যদেরও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
কেবল মাওবাদীদের আন্তরিকতার অভাবে সৃষ্ট মতপার্থক্যের কারণে সিএ ভেঙে দেয়া হয়েছে তা নয়। এর মূলে রয়েছে নতুন ফেডারেল ব্যবস্থার আওতায় পশ্চাদপদ গোষ্ঠীগুলোর দাবি কিভাবে পূরণ করা হবে সে বিষয়টি। সম্ভাব্য ১০ থেকে ১৪টি রাজ্য বা প্রদেশ চিহ্নিত করা হয়েছে, যার প্রতিটির নামকরণ করা হবে এক একটি সংখ্যালঘু গ্রুপের নাম অনুসারে। ‘জাতিগত ফেডারেল পদ্ধতি’ বলে পরিচিত এ ব্যবস্থার পরিণামের ব্যাপারে অনেকে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন। নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি সুশীল কৈরালার মতে, তারা নেপালিদের একে অপরের বিরুদ্ধে সঙ্ঘাতে লিপ্ত করিয়ে দেশকে আফগানিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
ভট্টরাই একে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ক্ষমতাসীন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকেই এ জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। ২০০৭ সালে মাধেশি গ্রুপগুলো রাজপথে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছিল কিন্তু বর্তমানে নেপাল জাতিগত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ ধরনের ফেডারেল পদ্ধতি এখনো প্রবর্তিত হয়নি। সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে নানা সামাজিক গ্রুপ। কোথাও চিহ্নিত গ্রুপের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। কেউ কেউ যুক্তি দেখাচ্ছেন যে খোদ গণতন্ত্রই কালের আবর্তনে উচ্চ বর্ণের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনবে।